রবিবার, ১৭ মে, ২০১৫

গল্পঃ পঙ্গু

গল্পঃ পঙ্গু
লেখাঃ শেষ সন্ধ্যার কবি .
নির্বাক তাকিয়ে আছে রিমন। নির্বাক বললে ভুল হবে, চোখ দুটো কিছু বলতে চাইছে। হয়তো মেঘ থেকে বৃষ্টি ঝরাতে চাইছে। রাস্তার সকল মানুষ গুলো আড়চোখে দেখছে তাকে। নিজেকে যে সে আজ অপমানিত ভাবার অধিকার টুকুও হারিয়ে ফেলেছে। বুকটা কষ্টের তাড়নায় বারবার ওঠানামা করছে। এত গুলো মানুষের মাঝে কি এক জন ও নেই তার হয়ে কথা বলার! আবারো বকাবকি শুরু করে সেই লোকটি -
---শালার হাত কাটা পাবলিক, যা পারিসনা তা করতে যাস কেন, হুম?
---আমি সাইকেল ভাল চালাতে পারি, কিন্তু দুর্ঘটনা তো যে কারো ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। -নির্লিপ্ত কন্ঠে উত্তর দিল রিমন।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই ভদ্র লোকের আরেকটি থাপ্পড় এসে লাগল রিমনের বাম গালে। এবার আর না কেঁদে পারল না রিমন। দুহাত জোড় করে যে ক্ষমা চাইবে সেই সাধ্যও যে তার নেই। বাম হাতে তার সাইকেল টা এখনো ধরা রয়েছে। কিন্তু ডান হাত? না সেটি তার নেই। বিধাতা কেড়ে নিয়েছে তার সে হাত। তাই আরো কিছুটা অশ্রু বিসর্জন দিয়ে মুখেই উচ্চারণ করে রিমন--
---প্লিজ আমায় ক্ষমা করুন।
তখন যারা এই তামাশা দেখছিল তাদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ বলে উঠল --- থাক ভাই বাদ দেন। বেচারা পঙ্গু মানুষ। একটু এক্সিডেন্টই না হয় করে ফেলেছে।।
লোকটি রিমন কে ছেড়ে দিল। সাইকেলটা ঘুরিয়ে আবার বাড়ির পথ ধরে রিমন। চোখে তখনো জল ঝরছে। ভাবতে থাকে রিমন। সে কি খুব বড় অপরাধ করেছে? মোড় ঘুরতে গিয়ে লোকটি তার সাইকেলের সামনে এসে যায়। এক হাতে ভাল ভাবে সামলে উঠতে পারেনি রিমন। তাই তার সাইকেলের সাথে ধাক্কা লেগে লোকটি পড়ে যায়। দামি জামা কাপড়ে ধুলা ময়লা লাগে কিছুটা। কিন্তু তার তো কোথাও তেমন আঘাত লাগেনি বা কাটেনি। তারপরেও থাপ্পড় গুলো দেওয়া কি খুব দরকার ছিল? সাইকেল চালাচ্ছে সে। কিন্তু চোখের পানিটাও মুছতে পারছেনা।
বাসায় ফিরে গম্ভীর হয়ে বসে থাকে রিমন। তার মা এসে জানতে চায় কি হয়েছে। কিছুই বলেনা সে। কিন্তু মুখের দাগ দেখে তার মা আৎকে উঠে বলে--
---বাবা কি হইছে তোর? মুখে দাগ কেন?
নিজেকে আর সামলাতে পারেনা রিমন। একহাতে যতটুকু পারে শক্ত করে মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে--
--- মা আমি কি মানুষ নই? কেন সবাই এত অবহেলা করে? কেন কেউ মূল্য দেয়না? পঙ্গু বলে কি আমার কোন স্বপ্ন থাকতে নেই?
---এমন করে বলিস না বাবা। -রিমনের মায়ের কন্ঠ রোধ হয়ে আসে।
রিমনের মা জানে রিমন কেমন। ছোট বেলায় দুর্ঘটনায় ডান হাত হারায় রিমন। সেটি তার বাবা মায়ের অনেক বড় কষ্ট। রিমনের মা ভাবে, দুনিয়ার অনেক মানুষ আছে যারা কোন না কোন ভাবে প্রতিবন্ধী। হয়ত কারো হাত নেই, কারো পা, কারো চোখ। কেউ বা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। কিন্তু তাই বলে কি তারা শুধুই কষ্ট আর অবহেলা পাবে? হোক সে জন্মগত বা দুর্ঘটনাবশত পঙ্গু বা প্রতিবন্ধী। কিন্তু তাদের দেহের মাঝেও তো একটা করে প্রাণ আছে।
রিমনের মায়ের রিমনের জন্য কোন লজ্জা নেই। কারন রিমন লেখা পড়া করে। রিমন এই প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও যে অনেক কিছু পারে এটা তার গর্ব। কিন্তু সবাই কেন উৎসাহ দেয়না? শুধুই পিছু টেনে ধরতে চায়, সে পঙ্গু এই দোহাই দিয়ে।
নামাজ পড়ছে রিমন। সে নামজ ছাড়ে না। নামাজ শেষে আল্লাহর কাছে হাত ওঠায়---- হে আল্লাহ, আমি জানি তুমি দেখেছ আজ আমি কত কষ্ট পেয়েছি। তুমি আমাকে সেই তৌফিক দাওনি যে দুহাত জোড় করে তোমার কাছে কিছু চাইব। তাতেও আমার কোন দুঃখ নেই। আমি জানি পৃথিবীতে তোমার অনেক বান্দা রয়েছে যারা আমার মতই অসহায়। তুমি তাদের সব কষ্ট হতাশা গুলো আমাকে দাও কিন্তু আর কাউকে আমার মত ব্যথা পেতে দিওনা। আমার মত যারা পঙ্গু রয়েছে তারাতো তোমারই সৃষ্টি। কিন্তু যে সমস্ত মানুষ তোমার এই সৃষ্টি গুলোর দুর্বলতা নিয়ে উপহাস করে, তাদেরকে আঘাত করে, সেই সব মানুষ দের তুমি কোন দিন ক্ষমা করো না।
চোখের পানি মুছেই চলেছে রিমন। হ্যা, শুধু বাম হাত দিয়েই। সে জানেনা বাকি জিবনে আর কত বার খোদার কাছে নালিশ জানাতে হবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন